Friday, 22 April 2016

অনুগল্প ~~সৃষ্টির আখর

September 12, 2013 at 11:19pm
সৃষ্টির আখর
ন ন্দি তা ভট্টা চা র্য
সৃষ্টি কোনকালেই ঠিকআমাদের মত ছিল না। সেই স্কুল জীবন থেকে ও কারো তোয়াক্কা করার ধার ধারতো না।পড়াশোনা নিয়েও ওর তেমন মাথা ব্যথা ছিল না। মাথাটি ছিল নারকেলের মত শাঁসে ভরা।পরিস্কার। ওর মত ইঁচড়ে পক্ক বন্ধু আর এ জীবনে পেয়েছি কি না সন্দেহ। সবাই যে দিকেইহাঁটবে ও ঠিক তার উল্টো পথে। যত রকম নষ্টামির মাস্টার। চেহারাটিও ছিল জম্পেশ। তাইনিয়ে ওনার এত উর্দুম কুর্দুম। পাতলা ঠোঁট, টানা টানা চোখ, গোল পানপানা মুখ,ছিপছিপে। এই ছিল তার যত কর্মকাণ্ডের পুঁজি। আমরা তাই ওকে একটু হ্যাটা করতাম। আমাদেরআবার পাঁচজনের গুছুনি, নিপাট ভাল মেয়ের দল। পড়াশোনায় প্রথম দশ জনের মধ্যে। নিজেদেরমধ্যেই ভাগ বাটোয়ারা করে নিতাম পজিসন। ফার্স্ট বেঞ্চটি আমাদের বাধা। পেছনের বেঞ্চেকারা বসে জানার কখন চেষ্টা করি না। প্রত্যেকেরই বাড়ির অবস্থা ভাল। ভবিষ্যতে কিছুএকটা হতেই হবে। এই মানে আর কী খাপে খাপ। আর সৃষ্টির ছিল পেছনের বেঞ্চটি বাঁধা।ওখান থেকেই ও ওর সাম্রাজ্য চালাত। আর কোন সময় হয়ত বলতাম, তোকে জানিস কেউ পছন্দ করেনা, না দিদিমনি-না স্যার। রাগ-টাগ ও কথায় কথায় অভিমান ওর কোনকালেই ছিল না। ওগুলোআমাদের সম্পত্তি। হেসে জবাব দিত, তাতে কি আইল গেল, মজা তো করতে পারতাসি। তরা থাকগাআহ্লাদি হইয়া, মুখ ভেঙ্গিয়ে বলত ‘ভাল মেয়ে’। কো এড স্কুলে পড়া। সুতরাং ক্লাস নাইনথেকেই শুরু হয়ে যেত লাইন মারামারি। আর সৃষ্টির তো এগুলোই মনের মত বিষয়। একদিন হঠাৎলাফাতে লাফাতে এসে বলল - ওরে ওই বাচ্চুটা না খুব পেছন ঘুরছে দিয়ে দেব নাকি একটুলাই। ভাব একবার। তার পছন্দ হল কি না, তায় বয়েস হয়েছে কি এগুলোতে মন দেবার! কেবোঝাবে! একসঙ্গে চার-পাঁচ জনেক ফ্লার্ট মারাটা ওর কাছে কোন ব্যাপার ছিল না। আমরাআবার একে বিশ্বাসী। তায় নেকু-পুষু, বাবারে এই বয়েসে প্রেম। মাধব, মাধব! পড়াশোনা নিয়েব্যস্ত থাকি। আর বিকেলে স্কুলের পর বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা। ব্যাস সন্ধ্যের আগেবাড়ি ঢোকা, তারপর ঘাড় গুঁজে পড়া। মায়ের আদেশ মান্য করা ইত্যাদি ইত্যাদি। আহা আহামেয়ে আমরা। যদি বলতাম, আচ্ছা এতগুলো ছেলের সঙ্গে তুই যে এই বয়েসে এ রকম করিস তোরকিছু মনে হয় না? সবাইকে ঠকাচ্ছিস। কি রকম কষ্ট লাগে যে। সব কয়টার লাইগ্যাই কষ্টহয়। কি রকম চাইয়া থাকে! ঝোলো ঠ্যালা! তারপর সেই গা জ্বালানো হাসি। বাঙ্গাল ভাষায়কথা বলত সবসময়।
হঠাৎ একদিন স্কুলে এসে দেখি সৃষ্টি খুব উত্তেজিত। বাড়িতেসত্যনারায়ণ পুজো, ওর মা বলেছেন আমাদের নিয়ে যেতে। আমার যে ওর প্রতি একটু দৌর্বল্যছিল সেটা সবাই জানত। তাই ও অপেক্ষা করছিল আমি আসার। কারণ আর সবাই যে ওকে তুড়ি মেরেউড়িয়ে দেবে ও সেটা জানত। ততদিনে আমরা জেনে গেছি ওর বেশ একটা গভীর গভীর কোন ব্যাপারচলছে। সে আসবে শুনছি, একটু দেখার লোভ ও হল। গরু জোয়ালে জুতবে কি না দেখেই আসি।সত্যনারায়ণ পুজোতো একটা ছুতো। আমরা পাঁচজন বল্লাম, চ’ ঘুরেই আসি কি আর হবে। টিফিনেচলে যাব আবার টিফিন শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসব। কেউ টেরটিও পাবে না। ও যে দিদিমণিস্যারদের সুনজরে নেই সে তো আমাদের খুব ভাল করে জানা। তাই আমরা একটু ভয়েই থাকি।চুপিচুপি টিফিনে কেটে পড়লাম। ওর বাড়ি আমাদের স্কুলের একদম কাছেই। পৌঁছেই তাড়ালাগাতে লাগলাম, প্রসাদ তাড়াতাড়ি দে, আধ ঘণ্টার মধ্যে স্কুলে পৌঁছতে হবে। দেখলামতেনাকেও। বেশ বয়েস, লোক, ছেলে কোথায়! মন খারাপ হয়ে গেল আমাদের। আমরা সেদিন নামদিয়ে দিলাম ‘ফিস’। কোন মানে নেই নামের। পছন্দ হয়নি বলে বোধহয়। আমরা বেরোবার জন্যেউসখুস করছি সৃষ্টি বলল, চল তোদের একটা মজার জিনিস দেখাব। আবার কি পাক খাচ্ছে ওরমাথায় কে জানে! কোন পোকা কিলবিল করে উঠল। নিয়ে গেল পাশেই একটা ঘরে। ছোট ঘুপচিঅন্ধকার স্টোর রুম। সেখানে ডাই করে জিনিস রাখা। এখানে কোন্ স্বর্গ ও আমাদের দেখাবেবুঝতে পারলাম না। আমাদের ছিলা টান টান। সৃষ্টির মা একটু উদাসিন ধরনের মানুষ। আরছেলে মেয়ে ও সংসার নিয়ে মাথা ঘামাবার মত মানুষ তিনি নন। খেয়ালই করলেন না মেয়েসবাইকে নিয়ে কোথায় গেল। ওই নোংরা ডাই থেকে দেখি টেনে বার করল একটি বই। বা বা ওরআবার পড়ায় এত মন কবে থেকে হল! বই তো আমাদের প্রাণের জিনিস। পাতার পর পাতা ছবিদেখাতে লাগল ও। ভিরমি খাবার যোগাড় আমাদের। বুক শুকিয়ে গেল। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসবে।ভীষণ জল তেষ্টা পাচ্ছে। হাত পা থর থর করে কাঁপছে। ছুটে বেরিয়ে আমরা এক দৌড়েরাস্তায়। সৃষ্টি নির্বিকার, কি খুব ভাল মেয়ে, না! দিলাম তো জাত মেরে। খ্যাক খ্যাককরে হাসছে। তাড়াতাড়ি স্কুলে ফিরে এলাম আমরা। ঘেমে নেয়ে অস্থির। কেউ কারও সঙ্গে কথাবলছি না। সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে ক্লাসে ঢুকে পড়লাম। কয়েকদিন চলল আমাদের মধ্যে গুজ গুজফুস ফুস। ভুতে ভর করার মত আমাদের অবস্থা।
ইতিমধ্যে মাধ্যমিকপরীক্ষা চলে এল। পাস করার পর কে কোথায় ছিটকে পড়লাম। আমাদের মধ্যে চন্দ্রিমা চলেগেল দার্জিলিং। ফোনে কথা হলে সবার কথাই জিজ্ঞেস করা হয়। এর ওর তার খোঁজ নি। কারণদার্জিলিং থাকার সুবাদে অনেকের সঙ্গে দেখা হয় ওর।
হঠাৎ একদিন চন্দ্রিমারফোন, এ যে তেনার সঙ্গে দেখা হল, দার্জিলিং বেড়াতে এয়েচেন! এই নে, ফোন নং দিতেবলেছে তোকে! দেখিস সাবধানে এবার কিন্তু সত্যি ভুত দেখিয়ে ছাড়বে!
(প্রকাশিত -- আগুনমুখা
ডিসেম্বর ২০১২ )

পরিবত্তন

September 29, 2013 at 11:18am
পনের বছর আগে
নতুন পাড়ায় এসেই সুমির গাছ লাগাবার বাই আবার উজিয়ে উঠল ,
এপার্টমেন্টের সীমানার দেয়ালে টানা  অনেকটা জায়গা , ভারি পয়মন্ত মনে হল বেশ, বেশ
চোখ টেনে রাখার মতন , বাইরেও গেট থেকে রাস্তা অনেকটা ছাড় লোভনীয় বটে , মনে মনে 
ছকে নেয়  বাঁক ,দেয়ালের গা বরাবর দেবাদারু  চার পাঁচটা ,
রোজকার ঠাকুরের ফুলও তো চাই , তাই দু -তিন রকম জবা সিংগল ও ঝোপা  টগর আর অপরাজিতা ,
ভগীরথের সাথে শলা পরামর্শ পাকা , ছুটল একদিন অফিস ফেরতা শেয়ালদা ,
ষ্টেশনের গায় রয়েছে গাছ বাজার ,বেশ সস্তায় চারা বিক্রি হয়  ,
কেনা হল দেবাদারু জবা বিভিন্ন রঙের টগর অপরাজিতা , দেখ ওদিকে উঁকি মারছে
কৃষ্ণচূড়া- রাধাচূড়ার  ছোট্ট দুটি চারা , ব্যাগের ভেতর ভরে মহা আনন্দে বাড়ির দিকে ছোটা ,
ভগীরথ সরজমিনে জমিন হাতে গড়ে , বিহারের মাটি কোপান হাত , মাটি জানে তার মায়া ,
সার সার বসে দেবদারুর  জবা টগর আরও  রকমারি  , সকালবেলা  চায়ের কাপ হাতে
ব্যালকনি থেকে চোখ বুলিয়ে রাখা , আহা আহা বেড়ে ওঠা  তারিয়ে তারিয়ে দেখা , ওরে বাকি রয়ে গেছে
ছোট্ট দুটি চারা , হই হই করে বিকেলে সবাই জড় হল গেটের কাছে , 
ওখানেই লাগান হবে ওটা , সরকার  বাহাদুর  কত যে খুশী হবেন , এমন নিঃস্বার্থ কাজ , 
আপনি -কপনি নয় কো মোটে , আনন্দে আগল ছাড়া , মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শেষে ভগীরথের হাতের
মায়ায় মাটিতে আসন পাতে কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়া, হাততালি দিয়ে ওঠে সবাই কাজ হয়েছে সারা ,
হঠাৎ কোত্থেকে বাঁজখাই এক গলা -- থামান থামান আমার সীমানা থেকে আরও একটু দূর
লাগান আপনাদের চারা , অন্ধকার ব্যালকনি ঠাহর হয়নি আগে অন্ধকার ছায়া ,সবাই
এ ওর মুখ চাওয়া- চাওয়ি সীমানা আবার কোথায় এ তো সরকারী জমি , গাছ তো সবার ,
সবার মুখ নিচু , সুমির চোখ নিচু , টুসটুসে জলে লাভা  , অক্সিজেন হাওয়া ,
--নতুন পাড়ায় আসা , দরকার নেই ঝগড়া - দরবারে , চিনিনা বাপু কারোকে ,
পরদিন কেয়ার টেকার সমীর এলে পরে জিজ্ঞেস করে -- অই লোকটা কে রে খবর নিস তো ,
-- ওমা অ'তো পাড়ার রাখাল , শাসক দলের লোক ......
---অ......
দিন দু'য়েক আগে ,
অফিস ফেরত সুমি , গাছ দেখে তো হা ডালপালাগুলোর বংশ-বাতাস নেই , একেবারেই ন্যাড়া , একবার দেখতে পেল না কেউ , 
জিজ্ঞাসাবাদ নয় ! এখন সমীর নেই  সে জায়গায় শেখর , ডেকে জিজ্ঞেস করে -- করল কারা ?
--- অই তো সে , পাড়ার রাখাল  শাসক দলের লোক , ঘাঁটিও না বাপু মোটে , চেপে যাও একেবারে ,

সুমির চোখ নিচু , টসটসে জলে আগ্নেয়গিরির লাভা ......
,  ঠ্যাং খোঁড়া করে দিয়ে গেছে কারা কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়া ,

নন্দিতা ভট্টাচার্য

Saturday, 13 September 2014

মরিয়ম

মরিয়ম     



     

                                                                                             মূল অসমীয়া ঃ জয়ন্ত শইকিয়া

                      বাংলা অনুবাদ ঃ নন্দিতা ভট্টাচার্য
কালু নদির পাকা সেতুটির ওপর দিয়ে যেতে যেতে মরিয়ম বিবির একটু চুপ করে দাঁড়াতে মন  চাইল। সেতুর কয়েক ফার্লং দূরে ঐ কাঁটাতার লাগোয়া বি এস এফের ক্যাম্প
তার ওপারে বাংলাদেশের জালুয়াঘাটের মাথার ওপরে ডুববো ডুববো করেও ডুবতে না চাওয়া সূর্য মাছের ঝুড়ির মত ঝুলে আছে । ওপারের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে ও ভাবে রহমত মিঞা কি এখনও ওই কোনায় একটি ছোট ঝুড়িতে ক-খানা হাঁস-মুরগির ডিম নিয়ে বসে ? মরিয়ম বিবি জানে টাকায় সাতটা ডিমের জন্যে কেউ মানকাচর থেকে হেঁটে রংপুর আসবে না । তার  জন্যে আবশ্য মরিয়ম বিবির কোন আক্ষেপ নেই । আক্ষেপ শুধু উচ্ছল বোনটার জন্যে। বিয়ের পরের বছর দেখা হতে ই দিদি ওকে ক্ষেপাচ্ছিল,
                       ‘দক্ষিন শালমারার মাছ খাইয়া বেটি সুন্দর হইয়া গেলাম।‘
মরিয়ম বিবির গলা একমুঠো পাটের আটি  মত কে যেন চেপে ধরেছে । না ,আর দঁড়াবার সময় নেই,বেলা অনেক হল। মিরজুমলার মাজার শরিফ থেকে আজান শোনা যাচ্ছেবাসে ফুলবাড়ি  পৌছাতে  তিনঘণ্টা, তারপর নাগের বাঁধ দিয়ে গিয়ে তিনটে ছোট নদি পেরিয়ে ঘর পৌছান। আজ অনেকদিন পর মার কাছে এসেছিল । মার পাসপোর্টের কাজ এখনও শেষ হয়নি । দিদির জানাজা  হওয়ার এই ন দিন।  ফেনসিংর এপারের উঠোন থেকে মরিয়ম ও ওর  মা অনেকক্ষন কাঁটাতারের ওপারের দিদির গ্রামটির  দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ।  নাতিপুতিগুলোর জন্য বুড়ির বুকটা হা হা করে উঠল । ফেনসিংয়ের ওপারে একটি লোক সাইকেল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিল রহমত মিঞা নাকি ওটা ? না জামাইবাবু নুরুদ্দিন? মরিয়ম মাকে, মা মরিয়মকে জিজ্ঞেস করব করব ভেবেও করতে  পারল না । মরিয়ম দেখল ফেনসিংয়ের ওপারে ওদের পুরান ভিটার চিহ্ন হিসেবে কেন্দুঝোপ ও খেজুরের ঝোপটি এখনও রয়েছে । তার তলাতেই বি এস এফের ঘরের চালওরা ওখান থেকে দিদির বিয়ের আট-ন বছর পর উঠে এসেছিল দিদির বিয়ে হয়েছিল গায়ের ই নুরুদ্দিনের সঙ্গে গ্রাম মানে সাতচল্লিশের পর একটা  সাদা খুটির এপারে একদেশ ওপারে আর একচাচাজান বৌমারির ওদিকে মাস্টারি  করত, বাবা ছিল মানকাচরের হাবিলদার, সত্তর পর্যন্ত তো কারোর খেয়ালই ছিল না । পুরোটাই হা হা খোলা, রংপুর-রতনপুর মানুষ হেটে বাজার ইত্যাদি করত । যাবে না নাকি? বৌমারি বাজারে তো এই সেদিন ও টাকায় সাতটা হাঁস-মুরগির ডিম পাওয়া যেত,এক টিন রেডকাউ দুধ খুব বেশি হলে দশ টাকা ।
যেদিন কাঁটাতারের ফেন্সিং পোতা হল ,মরিয়মদের নিয়ে দশটি বাড়ির উঠোনের মাঝখান দিয়ে বুকচিরে চলে গেল সোজা নাক বরাবর সরকার এদিকে মাটি দিয়ে ওদের উঠিয়ে আনল । দিদি জামাইবাবুর ঘর–মাটি ওপারে চলে গেল। সেই দিদির মৃত্যু সংবাদ শুনে মরিয়ম ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসেছে দক্ষিন শালমারা থেকে ।
ইতিমধ্যে গ্রামীন ফোনে কথা হয়েছে জামাইবাবুর সঙ্গে । কাছেই থাকা গরু বেপারি আনোয়ার ওপার থেকে গ্রামীণ ফোনের একটি সিম এনে রেখেছিল। ওর কাজই এরকম ! প্রত্যেকদিন আই  এস ডি ? কম টাকা হবে ? গ্রামীণ ফোন থেকে লোকাল কলও হয় । অনেক অনুনয় করে আনোয়ারের সেই ফোন থেকেই মরিয়ম ওর জামাইবাবুর সঙ্গে কথা বলেছে।
হ্যাঁ, পাসপোর্টের কাজ হয়ে গেলেই  দাদা মাকে একবার নিয়ে যাবে । কম টাকা লাগে পাসপোর্ট অফিসে? টাকার কথা বললেই মরিয়মের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে । জামিদার মানুষ ছিল দাদাজান । দাদাজানের দান করা মাটিতে মানকাচরের দুটি স্কুল ঘর হয়েছে। পরে যখন ফেন্সিং দেয়া হল তখন সব মাটি ওপারে চলে গেল । কে ক্ষেত করতে যাবে ওখানে?
 দাদাজান জামিদার ছিল ,ভাইজান ফকির হল । পারলে মরিয়মের উচিত দু পয়সা দিয়ে ওদের সাহায্য করা ।  কিন্তু মরিয়ম দেবে কোত্থেকে ? স্বামীর মৃত্যুর পর ও-ই জানে কি করে দু মুঠো ভাতের গুজরান করে । দক্ষিন শালমারার ওর ভিটে ,ক্ষেতের জমি নদী সড়াৎ করে গিলে খেয়েছে। ভাগ্যিস শাশুড়ি ওকে ধাই বিদ্যে হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন । 
বাসের ঝাকুনিতে মরিয়মের কোমরটা ক্‌চ করে উঠল । বাসে গাদা গাদা পাটের আটি তোলার মত মানুষ তুলছে কনডাকটার । কাছে বসা ছেলে দুটো গুন গুন করে কথা বলছিল । দক্ষিন পারের ভাষা নয়, ভাটিয়াও নয় ,দেশি(গোয়ালপাড়ার) ও নয়  । কি ভাষা ? মরিয়ম কান পাতে, হ্যাঁ –শুদ্ধ কেতাবি অসমিয়া ভাষা হয়ত গুয়াহাটীর মানুষ ।
                     ‘সবাই বাংলাদেশী হয়ে যাচ্ছে এখানে দেখছ ?A
বাংলাদেশি ?—মরিয়ম  বাসের জানালা দিয়ে মাঠের ওপারের ফেনসিঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকে । এ পার থেকে এক ঝাক বক ওপারে উড়ে গেল । ওপারের একটি মানুষ বিকেলের ছায়া হয়ে দাড়িয়ে আছে। রহমত  মিঞা না কি? ও – কে?  বুক জলে ডুবে পাট তুলছে সুঠাম যুবক রহমত ! বেহেস্তের নুর যেন নেকদিল ইনসান রহমত মিঞার দু চোখে থিতু হয়ে আছে।
ওর বিয়ে যে বছর হল তার আগে একবার জামাইবাবু, দিদি ও রহমত মিঞার সঙ্গে নৌকো করে জলেশ্বর গিয়েছিল মরিয়ম বিবি। পাক পরবদিগারের খিদমদগার পীরবাবা হজরত শাহ সৈয়দ নাসিরুদ্দিন আহমেদ কাদেরি বগদাদীর পবিত্র মাজার শরিফ জলেশ্বরে জলেস্বর দরবারে রবিউল আউয়াল মাসের বার তারিখে ফাতেহা ই দোহাজ দামের উৎসব মোবারকের  জন্য আসাম, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে লাখ লাখ অনুগামীরা এসে জড়ো হয় । সেই মেলাতেই রহমত মিঞাদের সাথে এসেছিল মরিয়ম বিবি। সেই সময়ই রহমত মিঞা পিরবাবার মুরিদ ওর  দাদাজানের মুখে শোনা পিরবাবার কামেলিয়ত, নুবুয়ত, মারেফাত, হেদায়তের কথা ছাড়াও আরও   অনেক কাহিনি গড় গড় করে বলে গিয়েছিল মরিয়ম বিবিকেনৌকোর মাথায় বসে মাঘমাসের নাদিরপারের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মন দিয়ে সেই গল্প শুনছিল সদ্য যুবতি মরিয়ম ।
ছোটবেলাতেই অনাথ হওয়া মৌলানা ভাসানিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন পিরবাবা । হ্যাঁ – 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থানের' নেতা মৌলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী পীবাবার মুরিদ ছিল। একবার ছোটবেলাতে মৌলানা ভাসানী কোন কিছু চুরি করে পিরবাবার কাছে মিথ্যে কথা বলেছিল --'যে বেইমান এই কাজ করেছে ,জিন্দেগিতে তার আর কোন কাজ হবে না।' তখন সর্বজ্ঞ পিরবাবা মন্তব্য করেছিলেন—'তাই হোক ,হামিদের কথা যেন ফলে ।' হায়রে ভাসানি ,জিন্দেগিতে কোন স্বপ্নই সফল হয়নি ভাসানির। ধুবড়ির কত মুসলমান শুনল 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থান' । ভাসানি পালিয়ে গেলেন বাংলাদেশে । থেকে গেল শুধু একটা চর---ভাসানির চর। ভাসানির, ধুবড়ির কোন স্বপ্নই পুরন হল না । কি নেক আলম ছিল পিরবাবা? গোয়ালপাড়ার এম,এল, এ বলভদ্র দাসকেও পড়ার খরচ দিয়ে মানুষ করেছিলেন পিরবাবা।
তাইতো ,পিরবাবার কাছে তো হিন্দু-মুসলমান সকলকেই আল্লাহ রুহ  ও জান দিয়েছেন । ওরা জানত সবচেয়ে সুন্দর নামে ই আল্লাহ-কে ডাকা হয়।  আল্লাহর বাইরে ওরা যাকে যাকে স্মরন করে ,তাদেরকে তোমরা তিরস্কার কোরনা । কারন অজ্ঞতা বশত  আল্লহ সুবাহনাহু ওয়া তাল্লাকে তিরস্কার করবে।' কোরান মজিদের সুয়া আন আল মের ১০৮ নং আয়াত হয়ত ।এত  কথা রহমত বিবির মনে থাকে না ।
কিন্তু মরিয়ম বিবির কখনও কখন সন্দেহ হয় । (হে পাক পরবদিগার, তোমার রহমের সাক্ষীস্বরূপ পাঠানো  পিরবাবার হেদায়তকে  সন্দেহ করে আমি অবিশ্বাসী নই ।') কিন্তু মরিয়ম বিবির জন্য সত্যি এটা একটি কঠিন প্রশ্ন ।    
ও কে ? ও  কোথায় ?
ওর দাদাজানের যে বাড়িতে ওর বাবা জন্মেছিলেন , তখন ওদের জমি-জমা সব ভারতে ছিল । যে ঘরটায় ওর জন্ম হয়েছিল ,সেটা ভারতের মাটি । ক্ষেত-খামার,-- একবার ওরা বলল ভারতে গেছে আর একবার বলল  বাংলাদেশে গেছে । বড়টার সঙ্গে যা হয়েছে, হয়েছে , --বলে রহমত মিঞার সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে দক্ষিন শালমারার বুবুলের বাবার সঙ্গে বিয়ে দিল , তখন 'কবুল হো , কবুল হো ' , বলে বুবুলের বাপের গাঁয়ে গিয়ে পৌছাল  মরিয়মরহমত মিঞার কথা কখনও ফেনসিং এপারে পৌছাতে দেয় নি ।
অনেকটা জমি-জমা না থাকলেও , জমির পরিমান মোটামুটি কম ছিল না বুবুলের বাপের । ধান, পাট , সর্ষে ফলত জমিতে । কিন্তু হলে কি হবে ? নদি তো সব জমি খুবলে খেয়ে ফকির করেছে আমাদের । ক্লাস এইট পর্যন্ত অসমীয়া মাধ্যমে পড়েছে মরিয়ম । প্রত্যেক বারই হাত চিহ্ন দেখে দেখে ভোট দিয়েছে সে । গ্রামের ধাই বলে হাতে থাকা বিদ্যার জোরে ও বিধবা বলে কাজও জুটেছে ওর । দুটো ছেলে অসমীয়া মাধ্যমে পড়ে। আর কোন মাধ্যমের স্কুল তো নেই এখানে ! এই পাশে বসা ছেলে দুটোর মত মানুষের কথায় ও কখন কখনও ভাবে –মরিয়ম বিবি কি দুটো দেশের মাঝে ফেনসিংয়ের  মত ঝুলে আছে ?
কিন্তু ফেন সিং হয়ে কি শান্তি ফিরেছে ওই অঞ্চলে ? ওই সেদিন তো বাংলাদেশের ডাকাতদল এখান কার একজন স্ত্রীলোককে গরুরগাড়ীতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল ! ফজরের নামাজ পড়তে আসা বাংলাদেশের একদল লোক উদ্ধার করে ফেরত পাঠিয়েছে ।
মরিয়ম বিবি ভাবতে থাকে মানকাচরে ঠাকুরদার দানকরা জমিতে আসমীয়া মাধ্যম স্কুলের কথা ।বাংলাদেশে মৃত দিদির কথা , ফেন্সিঙ্গের অপারে থাকা রহমত মিঞার কথা , দিল্লি থেকে আশা মিরজুমলার কথা , বাগদাদ থেকে আসা পিরবাবার কথা ।  তারপর  জোরহাটে রিক্সা চালান বড় ছেলে বুবুলের কথা । বাড়িতে অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকা ছোট ছেলে ভুতুর কথা । ছোট ছেলের কথা মনে পড়তেই ও উদাস চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল । বাসটা লাফাতে লাফাতে শিঙ্গিমারী পার হল ।
বাড়ি পৌঁছেই মরিয়ম বিবি তাড়াতাড়ি করে উনুনে আঁচ দিল । ছেলেটার পেটে আগুনের খিদে ।   বেলায় পান্তা ভাত কটা খেয়ে শুয়েপড়েছিল । রাত এক প্রহর হল , কটা লাকড়ি কেটে রাখবে সে হুঁশ ওর আছে ? তারপর কাচা লংকা দিয়ে ভাত কটা মাখতে না মাখতেই দরজায় ধাক্কা !
'বুজান, অ বুজান।'
মরিয়ম বিবির বুকটা ধড়াস্‌ করে উঠল । গ্রামের দুটো ছেলের সঙ্গে জোড়হাটে বুবুল রিক্সা চালাতে যাওয়া থেকে ওর মনে শান্তি নেই ।পাশের গ্রামের দুটো ছেলে শিবসাগরে রিকশা চালাতে গিয়ে মার খেয়ে ফিরেছে দু সপ্তাহ হল। ওরা নাকি বাংলাদেশী ! প্রানটি নিয়ে কোনমতে ছেলেগুলো বাড়ি ফিরেছে ।  কার আবার এই সময় বেরোবার দরকার হল ?
'এই সময় কেরা আইল রে ? '
' আমি মতিহারির ভাতার ।'
ইয়া আল্লা—আর আসার সময় পেল না । ভাতের থালা দেখে রেখে মরিয়ম বিবি মিতিহারির ভাতারের পেছু পেছু এল ।
'ভুতু , দরজাটা বন্ধ কর '
না ভুতুর কোন সাড়াশব্দ নেই । হয়ত মায়ের ওপর রেগে আছে । সময় নেই ,অসময় নেই বাচ্চা বিয়োতে দে দৌড়  । মরিয়ম বিবি ওদের বাড়ি পৌঁছে দেখল মতিহারী হাঁটু গেড়ে বসে চাপ দিচ্ছে । উনুনের পাশে বসে ছেলেমেয়েগুলো চুলায় আগুন দিচ্ছে । ঘর বলতে-তো ইকরার বেড়ার এক কোঠা । ঘরের মাঝে বিছানা পাতা ,রয়েছে একটি কলস ও চাঁচবার জন্যে বাঁশের টুকরো । মরিয়ম ছেলেমেয়েশুদ্ধু মতিহারির ভাতারকে পাশের বাড়ি পাঠিয়ে দিল । পাশের বাড়ির আনোয়ারা হাতে পান সুপারি নিয়ে মরিয়ম বিবির কাছে এসে বসল । শেষেরটা হওয়ার পর নিজে জেলায় নিয়ে গিয়ে মতিহারির বন্ধ্যাকরন করিয়ে এনেছিল । সাড়ে চারশ টাকা মতিহারি আর আড়াইশ টাকা পেয়েছিল মরিয়ম  । তারপর আর কোথায় ছেলেমেয়ে না বিইয়ে থাকবে ! সরকারি হাস্পাতালের অলিগলিতে ঢোকার উপায় তো আর নেই । এই তো এখন মতিহারি হাটুঁমুড়ে মরিয়ম বিবির নাকের ওপর বসে ছেলে নামানোর জন্যে জোরে চাপ দিয়ে চলেছে । গরম জল বসিয়ে মরিয়ম মোতিহারির কাছ চেপে এল--জল ভাঙ্গছে । মেঝের বালি মাটিতে রক্ত-জলের ফোঁটাগুলো শুকিয়ে রয়েছে । হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে মতিহারি বলল সেই  কখন থেকেই সে জোর দিয়ে যাচ্ছেমরিয়মের একটু সন্দেহ হল । মতিহারি তো প্রথম পোয়াতি নয় – এত যে ছট্‌ফট্‌ করছে ,ভীষণ যন্ত্রণায় চোখ উলটে দিচ্ছে ,এর মানেটা কি ?
'এই আনোয়ারা , যা সুবর্ণ বুজানরে ডাকার জন্য কাউরে জলদি পাঠাইয়া দে ।' বাচ্চা উলটো হয়ে রয়েছে । এটা মরিয়মের হাতের কেস নয় । এখানে তো আর ডাক্তার নার্স নেই । রাত–বিরেতে বাদ দে ,দুপুর বারটার আগে ঔষধ দেয়ার জন্য দারয়ানকেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ । সরকারি
বিজ্ঞাপনগুলো তো দাঁত বের ,করে ঠ্যাং মেলে দাঁড়িয়ে থাকে । কেকেরাকুছির অভিজ্ঞ ধাই সুবর্ণই ছেলে বিয়োন মায়েদের শেষ ভরসা
সরকারি কথার আগাগোড়াই কোন ভরসা পাই না ।
গতবার মেয়েলি গলার, রোগা–পটকা একজন স্যার কাদা মাড়িয়ে এসে সরকারি সুযোগ-সুবিধার খা-খতিয়ান নিতে হাস্পাতাল এসেছিল। ম্যালেরিয়াতে মানুষ মারা যাবার পর গুয়াহাটি থেকে আসা মানুষগুলোর সঙ্গে কোন যোগাযোগ থাকতে পারে ! গতবছর একবার কি দুবার জেলার দুজন আধিকারিক  দেখা দিয়ে গেছেন । কিন্তু মরিয়ম বিবিদের কে জিজ্ঞেস করে ? সেই রোগা-পটকা এসে তাও যা হোক খোঁজ খবর নিল একটু,'আপনাদের জন্য সরকার অনেক সুযোগ সুবিধে দিচ্ছে জানেন তো ? হাস্পাতালে ফ্রি তে ওষুদ-বিষুদ দিচ্ছে জানেন তো । উপরন্তু মা-ও চৌদ্দশ  টাকা পাচ্ছে । আপনিও হাস্পাতালে ডেলিভারির জন্য নিয়ে গেলে টাকা পেতেন । মানুষ যায়না কেন ।
                  মরিয়ম বিবির হাসি পায় মানুষগুলো কি জানেনা ? কিন্তু ও বলে , জেবিবা বলে , সুবর্ণ বলে জেলার নার্স গলা চেপে ধরা সেলিমাও বলে । রোগা-পটকা চশমা মোছে আর লেখে ।
দক্ষিণ শালমারায় কোথায় আর মেটারনিটি ওয়ার্ড আছে ? জেলাতে নৌকায় গেলে কমপক্ষেও সাতশ টাকা লাগে ।তারপর তো ডাক্তার ,নার্স , সুইপার ,সকলেই আছে । সেলাইন ,পাইপ , ওষুদপাতি সব কিছুরই তো দরকার আছে । তারপর কাগজ বার করার জন্য কেরানিকে টাকা দিতে হয় । বুধবারের দিদিমনিরাও তো খালি হাত ঘুরে এসে গায়ের লোকদের ধমক-ধামক দিয়ে জিজ্ঞাসা করে ।
'রোগা-পটকা' ভয় পায় । তবুও সে লেখে, সঙ্গেরটাকেও ফিস ফিস করে কিছু বলে । তারপরও বলে যায় 'আপনারা কথাগুলো আর পালটাবেন না কিন্তু ?' 
'রোগা-পটকা' আর ঘুরে আসেনি কিন্তু । দক্ষিন শালমারার হাসপাতালের সামনে আরও দুটো বিজ্ঞাপন দাঁত বের করে  জিনের মত দাড়িয়ে রইল ।
আলো ফুটতে না ফুটতেই ফজরের নামাজের আগে আগেই মতিহারির বরের সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে সুবর্ণ রওয়ানা হল । তাড়াহুড়ো করে পৌঁছে সুবর্ণরও একি অবস্থা হল, ঠাণ্ডা মেরে গেল ও ।
'এই বুবুলের মা ওকে ঘরে রেখে দিয়েছ কেন  ? জেলায় নিয়ে যেতে হবে মনে হচ্ছে !'
রাস্তার যা অবস্থা ,গোয়ালপাড়া বা ফুলবাড়ি নিতে হলে তিনটে নৌকা বদলে গাড়ি ধরে যেতে যেতে বিইয়ে দেবে ছুড়ি নিয়ে সজা ধুবড়ি যেতে হবে মনে হচ্ছে ।
মতিহারির স্বামী নৌকার খোঁজে গেল । সঙ্গে কারিমউদ্দিন মাস্টার । ফিরে এল ওরা । নৌকা পাঁচশ টাকা চাইছে । আমার তো চারমাস মাইনে নেই । এই হাসপাতালে বাচ্চা হলে চৌদ্দশ টাকা পাবি  ,তার থেকেই নৌকর টাকা পরে দিয়ে দিবি ।
সকালের ব্রহ্মপুত্রর জল কেটে নৌকা এগোতে  লাগল । বাংলাদেশের দিকে রিনিকি রিনিকি সবুজের অবয়ব । মাঝে মাঝে নদির বালুচর ।
নায়ের ভেতরে সুবর্ণ ও মরিয়ম মতিহারির হাত পা ধরে আছে । মতিহারির কোন হুঁশ নেই । গলা থেকে হালাল করা গরুর মত গো গো শব্দ বেরোচ্ছে । নায়ের ছৈ-এর দু দিক কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়া  মতিহারির ভাতার ও ফজলুল ছৈয়ের ওপর বসে বিড়ি ফুকছে । একদল গরু নিয়ে যাচ্ছে মাঝি । গরুগুলো নড়াচড়া করছে না । ওদের শিং-এর ওপরে কাল মেঘ যেন সূর্যকে চেপে ধরেছে । ঝড় আসবে নাকি ? মতিহারির স্বামির মনটা কেমন কু গাইছে । ওরা কি ধুবড়ি পৌছতে পারবে ? মতিহারি বেঁচে ফিরে আসবে ত?
ফজলুল বিড়িতে শেষ টান দিয়ে বিড়িটা ছুড়ে জলে ফেলে দিয়ে বলল ,
'হাসপাতালটা এই বারেও হইলো না।নতুন মানুষ পাঠাবা বা কি হইল । ডাক্তার ,কম্পাউন্ডার রে ত আইজ অব্দি চোখে দেখলাম না । জীবনে তো কোন সুবিধা পাইলাম না । পানিতে ভাইস্যা ভাইস্যা ত জীবনটা শেষ হইয়া গেল ।'
ঠিক তক্ষুনি সুবর্ণ হাক পেড়ে উঠলো ' আর বোধহয় ধুবড়ি যায়া পাইবে না '
সঙ্গে সঙ্গে সবাই মেঘের গর গর আওয়াজ শুনতে পেল । মতিহারির ভাতার , ফজলুল , সুবর্ণ , মরিয়ম বিবি বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকা মতিহারি ,সবাই,সবাই শুনল।
মাঝি দুটো চিৎকার করে উঠল ,
'উই তুফান আইতাছে । নাওটা পাশের চরে চাপাইতে লাইগব '।
মরিয়ম মনে মনে ভাবল , কোথায় চাপাবে নৌকো ! আদি-অন্তহীন ব্রহ্মপুত্রে ঝড়-বাদলে ঘিরে ফেলা দুলতে থাকা নৌকো , লবন ছিটান মাছের ছটফট করতে থাকা মতিহারি – এই সবকিছু নিশ্চয়ই এর চেয়ে ভয়ের নয় । আসামের চরবাসিন্দা নাকি ও ? বাচ্চাটা জন্মাবার জন্য একটু মাটি পাবে ত ?
ততক্ষনে মতিহারির ছেলের পা দুটো বেরিয়ে ঝুলছে । কিন্তু ওর পায়ের তলায় কোন মাটি ছিল না । ছিল বৃষ্টির জল , ব্রহ্মপুত্রের জল !
                                   ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

   
 


                                                       

Saturday, 30 June 2012


                                সে , ওরা , আমি
                                                                      মূল অসমীয়া গল্প ঃ   প্রার্থনা শইকীয়া
                                                                       বাংলা রূপান্তর ঃ নন্দিতা ভট্টাচার্য
এক অদ্ভুত অস্থিরতা ওকে গিলে খাচ্ছে । বেরোতে চাইলেও বেরোতে পারছে না ।আবার এর ভেতরে ঢুকে থাকলেও মজা পুকুরের  মত ওকে নিঃশেষ করে দেবে। এই এক অদ্ভূত টানাপোড়েনের মধ্যে থাকতে থাকতে সে মাঝে মধ্যে ভীষন ক্লান্ত হয়ে যায়। সজোরে  প্রতিপন্ন করতে  চায় নিজেকে , নিজের স্থিতিকে । এরকম সময়ে সে সমমনস্ক বন্ধুবান্ধবদের দলে  ভিড়ে  যায়  নাহলে অস্থিরভাবে কবিতা লেখে ।  আর অন্য সময়গুলোতে এই টানাহেঁচড়ার চাপানউতরে সে একটি অদ্ভূত খেলায় ঢুকে পড়ে ।
ক্রিকেট ভদ্র লোকের খেলা তথাকথিত ভদ্রলোকের তালিকায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত না করলেও , ক্রিকেট ওর প্রিয় খেলা। ছোটবেলা , ওর গ্রামের অন্তরঙ্গ বন্ধুমহলে এক পাকা ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে ওর বেশ খ্যাতি ছিল। বাঁশের ফলা  নিয়ে মাটিতে পুতে স্ট্যাম্প বানিয়ে ওরা মহা আনন্দে খেলে যেত। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বসার শর্ত হিসেবে চাওয়া ক্রিকেট ব্যাটটি  মা ওকে পরীক্ষার পর দিনই এনে দিয়েছিল। আর সে দিন থেকেই সে হয়ে গেল ওদের ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক। ......... এগুলো পুরানো কথা । ওর অতীতের বর্ণময় স্ন্যাপ’শট এখন এগুলো কথা মনে হলে নিজেরই কেমন  হাসি পায়। মদের আড্ডায় হঠাৎ করেই সে অতীতের কথা বলার চেষ্টা করলেই ওরা চেচামেচি শুরু করে ।
‘বাদ দে, বাদ দে , মলুয়া (বন্ধুরা আমাকে মলুয়া বাঁদর বলে ডাকে) তোর  অতীত রোমন্থনটা  এবার দয়া করে বন্ধ কর ।‘
                       ও   চুপ করে যায় । তিন আঙ্গুল মাপের পেগের তলায় সে ঝাঁপ দেয়। ও এখন ওর পুরনো স্মৃতি নিয়ে পুরনো ক্রিকেটের মাঠে । নেশা বেশি হলে কখন  বাঁ হাত টা ওপরে তুলে চিৎকার করে – দে’টস  আউট ‘ বলে
আবেগিক মুহূর্ত গুলোতে সে নিজেকে একটি পরাজিত ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক বলে ভাবে। নিজের ভেতরে পাক খাওয়া  পরাজয়ের প্রতিটি মুহূর্ত ।  রি’ক্যপের সময় সে নিজের ভুল নিজেই নির্ধারণ  করে । আবেগের মুহূর্ত বেশি হল  অবশ্য  নিজের ভুলকে শূন্য বা শূন্যের সমতুল্য বলে ধরে ও প্রতিপক্ষের দোষ খুঁজে খুজে ‘গোবর’ বলে গালাগাল করে।   আম্পায়ারের দোষে খেলার মাঠে অনধিকার প্রবেশ করা  গোল কিপার , প্রতিপক্ষের সস্তা আক্রমণাত্মক নীতির শত ছিদ্রের মধ্যে থেকেও  ওর টিমের সবচেয়ে দক্ষ অথচ সর্বহারা ব্যাটসম্যান ও স্ট্যাম্প বদলানো হেলমেট না থাকা ওর কৃষক বন্ধুর মাথা লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা  প্রতিপক্ষের বলের মত  --সবাইকে সে ‘গোবর’ গাল দিয়ে নিজের আবেগের সাগরে ডুবে  থাকে । ওর এমন আবেগের মুহূর্তের স্থায়ীত্বকাল সল্প । কিন্তু  সজোরে ওর হৃদয়ের দরজায় কেউ কড়া নাড়ে ।   কখনবা  ঝমঝম বৃষ্টিতে , কখনবা ঠা ঠা রোদ্দুরে কখনবা বোমা  বিস্ফোরণে মৃত একশ একষট্টি জনের স্মৃতিতে ; টেবিলের সামনের  দেয়ালে চে’র ছবিখানার  দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কখন যে সে  আবেগিক হয়ে উঠবে তার কোন নিদৃষ্ট সময় ,কারন-অকারন,সকাল-দুপুর, তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই । আবেগের নেশার ওপরে ঢেলে দেয় কোয়ার্টার বা হাফ বোতল  ম্যানসন হাউস ,নাহলে নাম্বার ওয়ানের এক একটি লার্জ পেগ । আর পয়সা থাকলে রিচার্জ কার্ড কিনে ফোন করতে থাকে , সেই  মুহূর্তে ওর যাকে যাকে মনে আসে তাকে তাকে ফোন করে । ওর বন্ধুদেরকে –‘নমস্কার, দুঃখের ছায়ায় যদি একটুক্ষন না জিরোও তাহলে সুখের পাখী কোথায় এসে বসবে!......কি খবর বন্ধু...আমি তো বিস্মৃতি গর্ভে লীন হয়ে যাওয়া এক মাতাল প্রেমিক। ...জিজ্ঞেশ তো করতে পার কেমন আছি আমি !’                       
কখনবা সে বসন্তের মত চির  সবুজ হয়ে থাকে কখনবা  শো শো শব্দে বাতাসে ভেসে বেড়াতে চায় । শহরের একটি ব্যস্ত অঞ্চল  থেকে অন্য একটি ব্যস্ত অঞ্চলে রিক্সা করে ঘুরে বেড়ায় । গোল্ড ফ্লেক বা নেভিকাট ঠোটে নিয়ে আবার রিকশওালা কেও যাচে নেবার জন্য । তিনআলি বা চারআলির রাস্তার কোনের দোকানে বসে লিকার চা খায় , আবার রিকশাওয়ালা কেও খাওয়ায় । মার কাছ থেকে দরকার হলে বেশি পয়সা চেয়ে সে এভাবে গোটা বিকেলটা কাটায় আর রাতে বন্ধুর সঙ্গে মদের আড্ডায় ওর প্রিয় কবিতা আওড়ায় ---
             ‘...... আমার ভাবী স্ত্রীর শরীর ঢাকার দাম আমার খোরাকি খরচের সমান
             ভাবা যায় আমাদের বেচে থাকা ...
             তবু আমি ভালবাসি উলঙ্গ শিশুটির হাঁসি, পুরানো
            পৃথিবী নতুন হয়ে ওঠে আমার ক্ষুধার্ত চোখের সামনে
            সুন্দরী রমণীর হাড়ের কাঠামো সময়ের ভেতর
            দিয়ে চিতার দিকে চলে যায় আমি  দর্শনের 
            মোটা বই বিক্রি করে কিনি রুটি ও মদ
            শুধু বেচে থাকার জন্য এমনকি কখনো লিখে ফেলি
            বিশ্বাস করুন লিখে ফেলি অনাবশ্যক কবিতা......’
জীবনটা  ওর জন্য  হয়ে ওঠে অনন্য  । নিজের খেয়াল-খুশি ,ইচ্ছে-অনিচ্ছের পথ ধরেই পার হয়ে যায় সোনালি জীবনের প্রতিটি পল, প্রতিটি অনুপল।  বেহিসাবি জীবনের ‘বিন্দাস’  ঠিকানায় ও গড়ে তোলে ‘বেপরোয়া ‘ একটি জীবন । পাঠ্যক্রমের বই বিক্রি করে পাওয়া পয়সায় ও কেনে হুমায়ুন আহমেদের বই বা বুকে পুঞ্জিভুত জমে থাকা হাজার তাড়নায় যখন কোন  আড্ডায় যোগ দেয়, তখন ওর  হঠাৎ মনে হয় ---‘সামর্থ্য থাকলে কি না করতে পারত এই হতভাগা মানুষগুলো । একটু ক্ষমতার দরকার,একটু  সামর্থ্যর প্রয়োজন
                                                    ২
     ‘রিকশাওয়ালাকে সমর দশ টাকা দেবে না বলল। তর্কাতর্কি লেগে গেল ।সমর রিকশাওয়ালাকে মারধোর করল । কাছের গুমটি দোকানে বসে ও দেখছিল বোধহয়। রিকশাওয়ালাকে মারার সময়েই ও সমরকে ধরে আচ্ছা করে পিটুনি দিল।  সঙ্গে ধন ও সামসুলরাও ছিল। পুলিশ সবগুলোকে ধরে নিয়ে গেছে। ‘ –আসিফ ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল । মানুষটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে । ‘’এই ছেলেটার জন্য আমার এক দণ্ড শান্তি পাবার উপায় নেই ।‘ –বলে ভেতরে গেল বাবাকে খবরটা দেয়ার জন্য প্রথমে ‘যাবনা’ বললেও  সন্ধ্যের দিকে বাবা থানায় গেলেন। লক আপের মধ্যে ও, ধন, সামসুল আর একটা লক আপে আগের থেকে রাখা কিছু অচেনা বন্ধুদের মধ্যে ততক্ষনে ভাব বিনিময় শুরু হয়ে গেছে ।
‘রিকশাওয়ালাটাকে পয়সা কম দিল বলে মানুষটাকে মেরে কি তুই সাম্যবাদ আনতে চাইছিস এই তোদের মত কিছু  অকর্মণ্যর জন্যই এই আদর্শে ঘুন ধরেছেকথাগুলো  মনে রাখিস ।‘---ওর বাবা ওকে এ কথা কটাই বললেন।
     কোথায় যে ভুল হল তিনি আর ভেবে পান নাতার যতটুকু  দিতে পারার  সবটুকুই তো তিনি দিয়েছেন   তাকে সম্পূর্ণ ভাবেই গড়তে  চেয়েছেন কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে, ক্রিকেট খেলবে বলে স্কুল পালানো ছেলেটিকে আজ পর্যন্ত তিনি ছুঁতে পরলেন নাওর প্রত্যেকটি আব্দারের সংগে সঙ্গ দিতে দিতে তিনি ক্লান্ত। তেতো-কষার এক অপরূপ সংমিশ্রণে তার সংসার চলছে । স্কুলে চাকরি করেন ।স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বা তার নিজের ছোট ছেলেকে আজকাল তার ভাল-মন্দের ধারনা গুলো  দিতে সঙ্কোচবোধ করেনহয়তবা বড় ছেলের মত  এক অদ্ভুত যুক্তিতে ওনাকে খারিজ করে দেবে । ছোটবেলা যখন ও নিজের বিচার-বিশ্লেষন তুলে ধরে নিজের ভাবনা চিন্তাগুলো প্রকাশ করতো  তখন ওর বাবা চমকে উঠতেনকিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে  ওর প্রত্যেকটা ভুলের সপক্ষেও যখন ও যুক্তি দেখাতে লাগল তখন বাবা আর ওর কথা গ্রাহ্যের মধ্যে আনলেন না। কিন্তু মা কি করে ওর কথাকে ,ওর ভুলগুলোকে ,ভুল আবদারগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দিল! ওর বাবা অবসর নেয়ার পর এক জনের আয়ে আর সংসার চলছিল না । তবুও ওর কলেজের ফিজ বা  বই কেনার পয়সা জুগিয়ে গেছেন। ওদের মনে হত সে যা চায় তাই দিয়ে দিলেই হয়ত সে শুধরে যাবে । ...।এর পরেও মারপিট করে থানায় যাওয়া কমে নি ।  অব্যাহতি মেলেনি বাবার থানায় গিয়ে জামিনে ছাড়িয়ে  আনা-ও ।  .....ওনার অসহ্য লাগে । নিজের ওপরে রাগ হয় ।অনবরত রাগটা বিষাক্ত  কীটের মত তার মগজে আক্রমন ঘটায় ।
  .......‘আমার টাকা লাগবেবই কিনব ।
কোন জড়তা না রেখে সে রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলল আগেরদিন বাজার থেকে আনা মিষ্টিকুমড়োর ডাটিগুলো কাটতে কাটতে মা জিজ্ঞেস করলেন---
‘কত?’
‘একহাজার’
 মাথায় বাঁশপাতার পোকাটি কিলবিল করে উঠল ।
‘লজ্জা নেই তোর ‘ ঝগড়া করে জেলের ভাত খেয়েও  লজ্জা হয়নি তোর! বই কেনার টাকা চাই তোর ! এই এক মাস হল তুই বই কেনার জন্য টাকা নিয়েছিস !মারামারি করতে করতে গুন্ডা হয়েছিস তুই ! বই পড়ে আর পণ্ডিত  হতে হবে না তোকে !
‘ রিকশাওয়ালাটাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিলে ভাল হত, না ? নিজের খিদের ভাত রেঁধেই কাত হয়ে যাচ্ছ , রিকশাওয়ালার শ্রমের মুল্য তুমি কি বুঝবে ?
পা দিয়ে এক ধাক্কায় বালতি সরিয়ে সে ঘর থকে বেরিয়ে গেল। ওর ভাল লাগা  মিষ্টিকুমড়োর  ডাটিগুলো এক  টান মেরে মা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিলেন ।
                                          ৩
                                
                                  ‘ ......... দুঃখের সাগরে
                                    নৌকো বেয়ে যাব
                                  ঝড়ে ক্লান্ত হয়ে
                                    বৈঠা  হারাব।   
                                 দিশা খুঁজব
                                 স্রোতের বিপরীতে নৌকো বাইব
                                  বেঁচে   থাকব বলে
                                   বেঁচে আছি বলেই
                                   উচ্ছিষ্ট চাটিনি   ......’  
ভণ্ড ,বুর্জোয়া মানসিকতাকে গালাগাল করতে ওর কোন ক্লান্তি  আসে না । ছোটবেলা বাবার মুখ থকে পাওয়া ‘কমরেড লাল সেলাম ‘-র  যে আদর্শ  ওর হৃদয়ে গেঁথে আছে তাকে আঘাত করা প্রত্যেকটা লোককে সে  ঘৃণা  করে! অন্তর থেকে । মায়ের প্রতিও ঠিক এ রকম একটি অনুভূতি পুঞ্জীভূত হয় । ওর রাগ হয় মায়ের ওপর । কথায় কথায় ওকে ঠাট্টা করা আদর্শবিহীন গৃহিণী জীবনে তার পুত্রের ধিক্কার ।  গৃহকর্ম আর স্কুলে যাওয়া আসা ছাড়া  কি-ই বা কাজ আছে মায়ের । কথায় কথায় আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার বাইরে একটিও ভাল কথা মা আজ পর্যন্ত বলেছে কি? ...।।অসহ্য লাগে  ওর । অসহ্যকর একটি মাথাব্যথা ওর মগজকে কুরে কুরে খাচ্ছেবাড়ীর বাইরে বেরিয়ে সে সামসুলের খোজ করে । ধনর পকেটের পয়সায় একটা ফুল ও একটা  হাফ বোতল কিনে ওরা অঙ্কুরের ভাড়াবাড়িতে গিয়ে ঢোকে । পুর রাতটাই ওরা মদ ও সিগারেটের ধোয়ার আবেশে  নিঁখোজ হয় ।  অন্য একটি পৃথিবীর সন্ধানে ও মদ গিলতে থাকে ।  আবার আবেগে ভাসতে থাকে।  অসংলগ্ন ভাষায় আবার আম্পায়ারকে গালাগাল করতে থাকে----
--‘শালা, শুয়োরের বাচ্চা ! আম্পায়ারগিরি দেখাচ্ছিস ,হ্যাঁ ! তোর নির্দেশে সমস্ত পুঁজিবাদী শাসক ঢুকেছে । আমার প্রতিপক্ষ ,শালা। ওদেরকে ইশারা করে আমার সর্বহারা খেলোয়াড়দের শুষে খাচ্ছিস ---ভাগ, শালা শুয়োরের বাচ্চা ,ভাগ,.........তোদের সব আউট ,সব আউট.........’   
মদের নেশায় যতক্ষন সে আউট না হয় ততক্ষন বকতে ই থাকে। মায়ের মুখটা মনে এলে ও সিগারেটের  ধোয়ার ধুম্রজাল তৈরি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে । ...... আর বাবার কথা মনে পড়লেই ও খুব  অস্থির হয়ে ওঠে । শৈশবের ক্রিকেট  গ্রাউন্ডের  মত অন্য একটি গ্রাউন্ডে সে বাবার হাত ধরে এগিয়ে যায় ।  পার্টির ‘হো’লটাইমার ‘ জাগাদিশ কাকা ও বাবার  সঙ্গে সে বাবার তর্জনী  আঁকড়ে ধরে হাটতে থাকে । কাশবনের  মাঝখান দিয়ে ওরা চরের মধ্যিখানে বাস করা  কয়েক ঘর মানুষেরর দিকে এগোয় । মানুষগুলোর সংগে বাবারা কথা বলতে থাকে ।কথা গুলো বুঝতে না পারলেও মন দিয়ে শুনছিল  ও ।ইতিমধ্যে সন্ধ্যে নামল ।বাড়ী ফিরে মিষ্টি কুমড়ো ভাজা খেয়ে কোন একটি ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়ল ওরা । ......... সকালবেলা ধন যখন ওকে জোরে জোরে ডেকে ঘুম ভাঙ্গাল , সে ধড়মড় উঠে  দেখল সেই একই পৃথিবী রয়েছে ,একই মানুষ, একই ক্রিকেট খেলা , একই ম্যাচ ফিক্সিং , একই পুঁজিবাদের অনধিকার প্রবেশ , ......একই , সব কিছুই এক......সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল । ধনর কাছ থেকে একশ টাকা নিয়ে সিটিবাসে ওঠে । কলেজের সামনের ‘দাদার দোকান’ থেকে একটা ফ্লেক ধরিয়ে উদাস দৃষ্টিতে  কলেজের দিকে তাকিয়ে থাকে  ব্যস্ত হয়ে হেটে যাওয়া  মানুষগুলোর দিকে ।  ...... হঠাৎই  ও সিদ্ধান্ত নেয় -----‘ কিছু একটা করতে হবে ; অন্তত পক্ষে রিকশাওয়ালা ঠেলাওয়ালা জনগণকে সন্ধ্যেবেলা লেখা পড়া শেখাবে .........কাজটা খুব শীগগির শুরু করতে হবে । ওর ছাত্রসংগঠনের ছেলেদের ও আরও বন্ধুবান্ধবদের কথাগুলো বলতে হবে । ,
         ঠিক  তখনই তাকে দেখল । ব্যস্ত পায়ে ইলিয়ট ,সেক্সপিয়ার ,ব‍্যগে ভরে দ্রুত  হস্টেলে ফিরছে সে । ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল । হঠাৎ ও চঞ্চল হয়ে ওঠে । তাড়াতাড়ি ফুটপাথ থেকে নেমে তার সঙ্গ ধরে ----
   ‘নমস্কার,  দুঃখের ছায়ায় একটু সময় না জিরোলে , কোথায় বসবে সুখের পাখী । কি খবর বন্ধু ? আমি ত স্মৃতি বিচ্যুত এক মাতাল  প্রেমিক । জিজ্ঞেস ত করতে পার কেমন আছি আমি !’
                                                       ৪
সে ওকে  যতখানি জানে সেই নিরিখে যদি  মাপতে যায় তাহলে ওর দশভাগের এক ভাগ জানতে পারবে । তবুও সে যতটা জানে ততটাই  যথেষ্ট বলে ভাবে --- সে ওর সঙ্গে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত । অর্থাৎ দুজনে একই মতাদর্শে বিশ্বাসী । ও মাঝে মাঝে মদ খেয়ে মাতলামি করে , আবার কলেজ নির্বাচন গুলোতে যে নিরন্তর ঝগড়াঝাঁটি চলে তাতেও সক্রিয় অংশ গ্রহন করে ; ও কবিতা লেখে , মাঝে মাঝে বিভিন্ন পেপার-ম্যাগাজিনে সেগুলো  প্রকাশিত হয় ; ওর একটা বৃহৎ  বন্ধুমহল আছে  ,ওর বন্ধুবান্ধবদের মতামত ওদের সংগঠনের সঙ্গে মেলে  ইত্যাদি ইত্যাদি । ওর সম্পর্কে সে এই খবরগুলো নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে । উপরন্তু কিছু খবর  ওর রুমমেট ওকে যোগাড় করে দিয়েছে । সেদিন সংগঠনের কাজ  শেষ করতে একটু দেরি হয়েছিল  --তারপর ও তাকে  বেশ রাত করেই রিকশা করে হোস্টেলে পৌঁছে  দিয়ে গিয়েছিল । আর সেই দিন রাতেই, আমার রুমমেট রাতে ভাত খেয়ে উঠেই, তাড়াতাড়ি তাকে বসিয়ে ওর সম্পর্কে জানা আরও খবর উগরে  দিতে লাগল ----
      ‘ দেখ চাকি ! তোর মা বাবা এখানে তোকে পড়তে পাঠিয়েছে , পড়াশুনো মন দিয়ে কর । ...... ও- যে কি খারাপ ছেলে তুই জানিস না । গত বছর ওর সঙ্গের একটি ছেলেকে মজা করে ক্ষ্যাপানোতে সে ঐ ছেলেটিকে মেরে হসপিটাল পাঠিয়ে  দিয়েছিল ।পুলিশ ওকে খুঁজতে এসেছিল । এগুলো কলেজের সবাই জানে ! তারপরেও ওর  রেজাল্ট দেখেছিস তো ? সেকেন্ড সেম দেয়নি । ও যে নিজেকে কি  ভাবে !......তুই ওর থেকে অনেক ভাল ছেলে পাবি, জানিস ?’
   ...... তবুও সে ওর কথা ভাবে !তার সঙ্গের  মেয়েরা যখন তাকে সি ,সি, ডি ‘র রঙ্গিন আড্ডাতে নিয়ে  যায় , তখন তার  ওর কথা খুব মনে হয় । কিন্তু কফির কাপে চুমুক দিয়ে কিম্বা ওর রুমমেটের ছেলে বন্ধুদের  শপিং মলের  বাইরে থেকে কিনে দেয়া পপকর্নের প্যাকেট হাতে নিয়ে  সে উপলব্ধি করে ‘ আসলে ওর রুমমেটের কথামত ও একটি খারাপ ছেলে । তাকে  সুখী করার মত , বা তার ইচ্ছে পুর্ন করার মত কোন ক্ষমতা ওর  নেই , ও খারাপ ছেলে  র নিজের কন ভবিষ্যত নেই  । তাহলে অন্যের ভবিষ্যতের দায়িত্ব ও কি করে নেবে?  ও মদ খেয়ে মারামারি করে । ...।।কবিতা লিখতে পারে বা সাম্যবাদ নিয়ে বড় বড় বুলি ঝাড়তে পারে  , কিন্তু  ও তোকে ধোকা দিচ্ছে  মাত্র । ওর সঙ্গে গিয়ে কি সে একটা উশৃঙ্খল জীবন যাত্রা বেছে নিতে চাইছে ? ‘...... অনিচ্ছাসত্বেও বাজতে থাকা  মোবাইলটা সে  হাতে তুলে   নেয়---
 ‘হেল্ল ‘।
  ‘ কি খবর ...... আজ অনেকদিন পর তোমায় দেখলাম। একটা খুব জরুরি কথা তোমায় বলার ছিল । আমার তোমাকে ভাল লা......’ ‘অহ’!(সে ওকে বাক্যটি  সম্পূর্ণ করতে দিল না )  বাড়ি   থেকে   ফোন করছে । ‘ওয়েটিং –এ  আছে কলটি । আপনি প্লিজ পরে চেষ্টা করুন । ‘
একটু পর ও আবার ডায়েল করল ওর প্রিয় নম্বর ৯৯৫৪১......
তাকে অতিষ্ঠ কর তুলল  অসহ্যকর সেই কণ্ঠস্বর ---‘দি এয়ারটেল কাস্টমার ইউ আর ট্রায়িং টু কল ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ । প্লিজ কল আফটার সাম টাইম ।‘
                                                   ৫           
      অতিষ্ঠ হয়ে ও হাত থেকে মোবাইল ফোনটা মাটিতে আছড়ে ফেললো । বাড়িতে ফিরে  যাওয়ার কথা ভেব ও চুপ করে বসে রইল । অঙ্কুরের ভাড়া বাড়িতে বসে ও মদ খাওয়ার কথা ভাবে । প্রচণ্ড একটি  অভিমান ওর বুকে জমা হয়েছে,  জেগে উঠছে এক গভীর বিষাদ-সিন্ধু ওর  মনে । সে  জীবনকে নিয়ে   মগ্ন হল  ,জীবনকে মেপে দেখতে চাইল  ----  দৈর্ঘ ও প্রস্থে , প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিতেকিন্তু ও যে ভুলে যায় পাটীগণিতের হিসেব ;যাপন করে এক বেহিসেবি ,বেপরোয়া  জীবন এবং আবারও ব্যর্থ হয় । ও ভাবা সত্যি কথাগুলো বার বার কেন মিথ্যে হয়ে যায় ---সাম্যবাদ থেকে শুরু করে  ওর জীবনের ছোট  ছোট ঘটনা গুলোতে অবাঞ্ছিত প্রতারকের দল অনধিকার প্রবেশ করে ওকে  নিঃশেষ  করে দিচ্ছে । সুরক্ষিত ভবিষ্যতের পূর্ব শর্ত পালন করতে পারিনি বলে আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক। ও আবার উদ্বেলিত ,ভাসমান । সদ্যসামাপ্ত ক্রিকেট খেলার পরাজিত দলের অধিনায়ক হিসেবে প্রেস বিজ্ঞপ্তি  দেয়ার কথা ভাবে ---- ‘ আসলে আবহাওয়া আমার অনুকুলে ছিল না । টসে হেরে প্রথম ব্যাটিং করার জন্যেই এমন হল । প্রতিপক্ষকে সঠিক উত্তর দেবার সপক্ষে আমাদের সর্বহারা দলটির কাছে আসলে কিছু  ছিল না ---- জীবন সুরক্ষার জন্য বিজ্ঞান সম্মত ভাবে তৈরি হেলমেট , রান নেওয়ার জন্য দৌড়ানোর সামর্থ্য ,একজন  শক্তিশালী খেলোয়াড় হওয়ার জন্য পুষ্টিকর আহার ...... আমাদের এগুলোর কোনটাই ছিল না । ...... অথচ সব আছে ভেবে বোকার মত আমরা ময়দানে নেমে পড়েছিলাম ।
এক অসহ্য রকমের মাথা ব্যথায় ও কুঁকড়ে যায় , ওর ঘিলুটা যেন কে নিংড়ে নিচ্ছে তিন পেগ শেষ করার পরেই ও আম্পায়ারকে গালাগাল দিতে শুরু করে ---- ‘ শালা প্রেমের বাজারেও নিলাম হয় আমার অনুভুতি । ধূর্ত আম্পিয়ার ! প্রেমের বাজারেও তুই ব্র্যাণ্ডেড বর সাজিয়ে সাজিয়ে পাঠাচ্ছিস ।  সব তোর পুঁজিবাদী চাল , সব তোর ইশারায় চলছে !...শা...লা আম্পয়ারগিরি দেখাতে এসেছিস  হাঃ , তোর ঈশারাতেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে পুঁজিবাদের ...... শালা সব ব্রান্ডেড ------ব্যাট , বল , জুতো , বর ...... শা...লা তদের অঙ্গুলির নির্দেশে আমরা সর্বহারায় পরিনত হয়েছি ---- ভাত, ঘর, ইজ্জত, প্রেম সব তোরা শুষে নিচ্ছিস ......শ।।লা ... কুকুর ,ভাগ ,ভা – গ , শা ... লা... এখান  থেকে ।‘
পরেরদিন আবার সামসুলের কাছ থেকে একশ টাকা ধার করে।  রিক্সা করে  উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে একটি ব্যস্ত অঞ্চল থেকে অন্য একটি ব্যস্ত অঞ্চলে ও ঘুরে বেড়াতে লাগল । মাঝে  মাঝে  একটু লিকার চা ,একটা  বিড়ি বা সিগারেট ।  রিকশাওয়ালাকেও খাওয়ায় । অনেক কাজ করার কথা ভাবে সে ! ...আবার ভেসে যায় আবেগে ...। বসন্তের মত সবুজ হতে চায়—সুবাতাস হয়ে ভেসে থাকতে চায় একটি সুন্দর সুরের মত......
 পরিশিষ্ট
   জসমি, পম্পি , চাকির  অযৌক্তিক প্রত্যাখ্যানের পর সে  অনেকবার মদ ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছিল । সিগারেট ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছিল। এক সপ্তাহ পর পর চান করা ছেড়ে প্রতিদিন চান করার কথা ভেবেছিল । ... কিন্তু এত সহজে কি সব বদলে ফেলা যায় !সেটা সামাজিক  পরিবর্তনই হোক বা ওর মনের গতিরই হোক !ওকে আমি সঠিক অর্থে  বুঝতে পেরেছি বলে দাবি করছি না । কিন্তু বন্ধু হিসেবে সে যখন আমাদের তার অসন্তুস্টি ও অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস ঝরায় , তখন বার বার ই  আমদের আলোচনা হয় ওকে নিয়ে।
১ম  বন্ধু---  ও আসলে বড় আবেগে ভাসে । কিন্তু আজকালকার মেয়েরা তো এত আবেগ নিয়ে চলে না , ওরা প্র্যাক্টিকাল ছেলে খোঁজে । প্রেমিক হলেও ওকে প্রাক্টিকাল হতে হবে, সিসিডি , বারিস্থা , মাল্টিপ্লেক্সে নিয়ে যেতে হবে । আর যাই বলিস না কেন সাম্যবাদী প্রেমিকাও শালা একই ......আদর্শকেও ওরা ট্রেডমার্ক হিসেবে ইউজ করে ।
২য় বন্ধু---এই বাদ দে ওর  প্রেমটেমও আসলে সবসময় মধ্যমনি হয়ে থাকতে ভালবাসে আর এই জন্য এতরকমের বাহানা বার করে ।
৩য় বন্ধু--- কিন্তু মার কাছ থকে ফাঁকি দিয়ে  পয়সা  নেয়াটা কেমন কথা ।মা-বাবাকে ব্যতিব্যস্ত করে মারা !
৪র্থ বন্ধু--- বাদ দে তো! ও এক  স্বপ্নের জগতে বাস করে । আদর্শের ক্ষেত্রে বা প্রেমের ক্ষেত্রে ও ভীষণ ডিভো’টেড  !...... ও নিজের মত করে বাঁচতে চায় , এই ধর—স্নেহ-ভালোবাসা , সাম্যবাদী সমাজ , প্রতিবাদের ভাষায় লেখা কবিতা , এগুলোই ওর বাঁচার রসদ ।
... আমি সব সময় চুপচাপ থাকি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করি । কখন কখন এ রকম আলচনায় অংশ নেই ।বিশেষত যখন তিনটে  লার্জ পেগ খাওয়ার পর ওর  কথা ওঠেখুব সাবধানে  মন্তব্য করি । ---
আমি ঃ এক অদ্ভুত অস্থিরতা ওকে গিলে খাচ্ছে । বেরোতে চাইলেও বেরোতে পারছে না । এই অস্থিরতা ওকে গ্রাস করে,    তলানিতে এনে দাড়  করায়  । আর এই অস্থিরতার  টানাপড়েনে ও  ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে নিয়ত......... ।
§  গল্পটিতে উদ্ধৃত প্রথম কবিতাটির অংশ ‘হাংরি জেনারেশনে’র  বিখ্যাত বাংলা কবি ফাল্গুনি রায়ের কবিতা থেকে নেয়া ।
                                        ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~