Friday, 7 October 2011

ইরম- তোকে মরম

ইরম- তোকে মরম    

শর্মিলা
ইরম
তোকে জানাই
মরম    মরম    মরম ।
 চারদিকে ধুম লেগেছে হৃদকমলে ।
আলোর বিলাপ,মানুষের উদভ্রান্ত উল্লাশ ,ময়ুর নৃত্য
তারমাঝে তোর মুখ মনে পড়ে
টিউবের অলঙ্কারে শোভিত
উজ্জ্বল এক দ্বীপমালা , নক্ষত্রখচিত
রোমাঞ্চিত ভ্রুযুগল  কত কথা বলে
তোর চোখের তারায় জ্বলে ওঠে লোকতাগ লেক।
 অপেক্ষা--
গঙ্গাজল সই তোর
আফস্পার অশনি সঙ্কেত , রক্তের দাগ মুছে
এক নরম প্রলেপ লাগাতে চাস মানুষের বুকে।
ওদিকে ডেসমণ্ড কলমে আঁকে তোর মন
বসে আছে অপার হয়ে কবে রজকিনি,
নিকষিত হেম জড়িয়ে নেবে সব
বিহ্বল  বিষাদের কথা ।
অপেক্ষার
আর এক নাম
শার্মিলা ইরম
মরম    মরম     মরম ।

ভাঙ্গা গড়ার সাতকাহন


ভাঙ্গা গড়ার সাতকাহন

by Nandita Bhattacharjee on Monday, October 3, 2011 at 10:13pm
ষষ্ঠীর সন্ধ্যে থেকেই মায়ের মন খারাপ,বলেন নি কিছুই তবুও যেন চোখের দিকে তাকালে ,গালের ভাঁজের কাপনে , সন্ধ্যেতে আনমনা হয়ে বসে থাকা সবই যেন মুখর হয়  মায়ের আজ মন কোথায় আনমনা হয়েছে ।তক্ষুনি দাদার ফোন এল ,"বিল্বষষ্ঠী করছ ,কাকিমা,আমাদের সব কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল'যে জলটুকু সারাদিন চেষ্টা করে ধরে রাখা ছিল তা গড়িয়ে  পড়ল  বললেন ,'হ্যাঁ ,মনে মনে করছি। এই তো  উঠোনে বেল গাছের ডাল পোতা হয়েছে ।আমরা ছ 'জন জা ঘিরে বসেছি ।'আর কিছু বলা হল না ।
বাড়ীতে পুজো  হত । পুজো  থেকেও বেশি সারা পরিবারের মিলন মেলা ।সেখানে ধর্ম কতটুকু ছিল জানিনা। তাবে প্রবাসে থাকা বাড়ির ছেলেটি আসবে,  মেয়েরা  আসবে শশুরবাড়ি থেকে, পিসিরা  আসবেন । সকলে  এলেই    ছুটে ছুটে  বেরনো ,সে সকাল ,বা রাত দুপুরই হোক ।তারপর তো হই হই ।সকলের তদারকি। দিদিদের ফাই ফরমাশ খাটা ।বোনপো বোনঝি আমাদের  জিম্মায়। মায়েরা সারাক্ষন রান্নাঘরে ,আর আমাদের কপালে বকুনি।জাঁদরেল জ্যেঠামশাই চুন থেকে পান খসলেই  শব্দবান । বাবা তটস্থ । বেশ মজা লাগত ।দাদারাও  ভয়ে কাঁটা ।
বাড়িতে মূর্তি তৈরি হত। পুন্যদার সঙ্গে থাকতে হত ।পুন্য পাল বাড়ির পাশেই থাকত ।এটা দাও,ওটা দাও ।পুরান কাপড় দাও,তাতে মাটি লেপ দিয়ে কাঠামোর গায়ে আটকে দেয়া যাতে করে মাটি না ফাটে  । দেখতাম কি নিমগ্ন ভাবে খড় বাঁশের কাঠামো থেকে আস্তে আস্তে মাটি দেয়া,একটু একটু করে গোড়ে তোলা একটি অবয়ব ,শেষে ষষ্ঠীর দিন চক্ষুদানে গিয়ে শেষ  হত। পুন্যদাকে মনে হত জাদুকর। একটু একটু   করে মানস প্রতিমা রূপ দেয়া।
ষষ্ঠীর দিন বিকেলে  ঠাকুমা সকলের জন্য কেনা নতুন কাপড়ের ট্রাঙ্ক  নিয়ে বসতেন।একে একে  বড় থেকে ছোট সকলে যার যার প্রাপ্য  জামা কাপড় নিয়ে  যেতেন  । মায়েদের সকলের একই দামের  শাড়ী। বাচ্চাদের,ভাইদের একই রকম   ব্যবস্থা।  ভীষন  রকম সাম্যবাদ  মানা হত। বড়লোক  বাপের  মেয়ে বা ছেলে হলেই দামী জামা কাপড় পাবে সেটি হবার জো ছিল ন।
সপ্তমীর সকাল শুরু হত বাড়ির ছোট ছেলেদের ঘুম থেকে তুলে ফুল তুলতে পাঠান দিয়ে । ভোর চারটেতে উঠতে   হতো। সকালের আলো ফুটতেই ফুলের বোঝা নিয়ে সবাই ফিরল । ডালায় সবরকমের ফুল। এবার এগুলোকে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের   ,মেয়েদের।সাজিয়ে রাখা ভাগ ভাগ  করে ।তারপর মালা গাথা।তিরিশ চল্লিশখানা মালা গাথতে হত। এর মধ্যে সকলে যে যার মত বিভিন্ন রকমের কাজ খুঁজে নিত।কারোকে বলতে হত না । এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা ।দুর্গাঘরের কাজ  বড়দের তদারকিতে হত।
বাড়ির বা বাইরে থেকে আসা বয়স্ক মহিলারা গীত গাইতে বসে যেতেন । একেবারে দুর্গার আগমন, জাগানি, বিল্ববরন প্রতিটি পর্যায়ের গান ।  মধ্যে মধ্যে অঞ্জলি ইত্যাদি নিয়ম কানুন চলছে । দুপুরের পরিবেশনের দায়িত্ব পড়ত ছেলেদের ওপর ।তার মধ্যে  আত্মীয় স্বজনদের আসা যাওয়া খুনসুটি  । যারা হয়ত সারা বছরে আসতে পারতেন না তারাও একবার ঢুঁ মেরে  যেতেন । এই পুজোর সুবাদে  অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া ,অনেকের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হওয়া ।এমনকি দু চারটে বিয়ের সম্বন্ধ ,পাত্রি দেখাও ঘটে যেত ।  বাড়িতেই সব বয়েসের সঙ্গি জুটে  যেত ।তাই জায়গায় জায়গায় আড্ডা  জমত সন্ধ্যের পর। দেখা যেত গোল গোল হয়ে এক এক ঘরে এক দল সমবয়স্কদের মজলিশ চলছে। যদিও মা ,জ্যেঠিমা ,কাকিমারা সেই রাত বারটায় রান্না ঘর থেকে ছুটি   পেতেন। তাদের আড্ডাখানা ছিল রান্নাঘর ।কি আনন্দ, হাসি ,কলরব। হাতে হাতে কাজ করে   যাওয়া ।কোন  ক্ষোভ  নেই , আক্ষেপ নেই, অনাবিল আনন্দ, মাহামিলন ঘটেছে ।  তিন দিন ধরে এই নিরলস কর্মকাণ্ড চলেছে ।
দশমীর দিন এল।যেন বাড়ির মেয়েটি পিত্রালয় থেকে শ্বশুরঘর যাবে । মায়েরা এই তিনদিন নতুন কাপড় পরার সময় পাননি ।সেদিন পরলেন ।মেয়েকে যাত্রা করালেন চোখের জলে ।  মায়ের ঘর শূন্য মেয়ের যাত্রা । ট্রাকে   তোলা হল প্রতিমাকে ।জ্যেঠামনি সুর ধরলেন,
                                                 মারে ভাসাইয়া জলে
                                                    কি ধন লইয়া যাইমু ঘরে
                                                         ঘরে গিয়া মা বলিব
                                                                কারে গো ,ও  মা ।
                                                        হিমালয়ের যত নারী
                                                          তারা কান্দে  গৌরি গৌরি
                                                                 কান্দিয়া কান্দিয়া
                                                                        ধরণী লুটায় গো ,ও মা।

তাই মা আজ ভাঙ্গা যৌথপরিবারের স্মৃতিচারনায় চোখ ভাসান ।খুঁজে বেড়ান মাহামিলনের সোপানগুলো । সোনাঝরা  দিনগুলোয় ঝাপ  দিয়ে খোঁজেন চেনা মুখ  । আর বিড়ম্বিত হয়  ষষ্ঠীর বিকেল।
                                                                        ঃঃঃঃঃঃঃ
· · · Share · Delete

    • Anupam Das Sharma দৃশ্যায়িত হলো যেন। এমন নির্ভেজাল শারদ আনন্দ আজ গল্পগাথা। প্রায় বিলুপ্ত যৌথ পরিবারের মতই ।
      October 3 at 10:19pm · · 1 person
    • Nandita Bhattacharjee ঠিক বলেছ অনুপম কত সাধারন অথচ কত অসাধারন ছিল তার আনন্দ,,,,,
      October 3 at 10:22pm · · 2 people
    • Anupam Das Sharma আমি খুব অভাববোধ করি। আমাদের যৌথ পরিবার কালের গ্রাসে পরমানু। পড়ে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো। কি অফুরান আনন্দ গমগম করতো সে সময় !!
      October 3 at 10:26pm · · 1 person
    • Nandita Bhattacharjee vishon sotyi,,,ajkalkar bacchader jonyo sotyi kosto hoi.6 mash boyesh thekeo oneke creche thake.ki vayanok din elo.
      October 3 at 10:28pm · · 1 person
    • Anupam Das Sharma Thik tai.. Bachhagulo jantrik hoye jachhe. Magojastro ar toiri hobe na...
      October 3 at 10:29pm · · 1 person
    • Debabrata Acharjee দক্ষিণ ভারতের কোন এক প্রান্তে, ফ্লাট বাড়ীর এই লিভিং রোমে বসে আমি ঠিক বুঝতে পারছি উনার দুঃক্ষটা। ভাঙ্গা গড়ার সাতকাহনে আমরা হারিয়ে ফেলেছি অনেক কিছু...
      Tuesday at 12:56am · · 2 people
    • Nandita Bhattacharjee thik bolecho debabroto,,,,amra chutchi,,,,
      Tuesday at 12:57am ·
    • Debabrata Acharjee কোথায় যে ছুটছি সেটা কি আমরা জানি? শুধু ছুটেই চলেছি।
      Tuesday at 1:00am ·
    • Debabrata Acharjee মাঝে মাঝে বাউল হতে ইচ্ছে করে..।
      Tuesday at 1:01am · · 2 people
    • Nandita Bhattacharjee thik jotro totro bichoron kora ,,,,mon mele diya jekhane khushi beriiye pora,,,,,,
      Tuesday at 1:02am · · 1 person
    • Chandrani Purkayastha thik..amar o tai mone hoy... nijer aim in life niye chut te chutte aj janina kuthay amar gontobyo.. ek mechanical jibon ki amar gontyobyo hote pare? tai bhabi.. na.. sei jibon ami chai na... tahole keno chutchi.....othocho..abar amar swopno gulo amake tariye tariye nije chole sei odbhut gontobyer dike.....amara Bisorjon natoker raja hoye uthchi na to????????????????
      Tuesday at 9:34am · · 1 person
    • Nandita Bhattacharjee ei tanaporen niyei to amader jibon,,,ei pure pure chola,,,
      Tuesday at 9:35am · · 1 person
    • Alok Biswas bah! phoner ringtonei to nore uthlo bishnna , tumi katha bole, deke uthle kakimake. sundar cchabi eakeccho nandita.
      Tuesday at 9:36am · · 1 person
    • Nandita Bhattacharjee thik alok,,,khub miss kori barir pujo ar joutho paribar,,,,,,
      Tuesday at 9:40am · ·


শর্তহীন কই

by Nandita Bhattacharjee on Monday, October 3, 2011 at 12:10pm
আবার তুই আগের
মত হবি যদি কথা
দিস, তবেই কিন্তু
বসা যেতে পারে
অলিন্দে ,বোঝাপড়ার
খেরোরখাতা হাতে--
সময় দেব, চুরি
গেছে যতখানি ।
আবার ভাসবে
সকাল উঁকি দিয়ে
 জোড়াখাঁচার পায়--
বিকেলটাকেও রাখব
বেঁধে উড়ান পাখনায়---
শর্তহীন সুখে ডাক
দিয়েছে মন, দেখি
তাতে পা দিয়ে
জল নাচে কেমন।  

সনেট-২ বাতিঘর

সনেট-২ বাতিঘর

 হঠাত এক অনিমিখ ত্রস্ত নাবিক

কথা হয়ে ডেকে ওঠে মেঘ জাগতিক

বাতিঘর জ্বলে ওঠে বালুকাবেলায়
ডেকে যায় বিহ্বল সিগাল অবেলায়।
ক্রমশ চারপাশ তার রহস্য আঁধার
ছায়া ছায়া কাল ধোঁয়াশার আশ
কুয়াশায় ছায়াবৃত ঢাকে মুখ তার
নিরবচ্ছিন্ন অস্ফুট অন্বেষণে গুঢ়তার বাস।


রহস্যের অবিরাম অশরীরী অবগাহন
ছায়াবৃত গুঢ় অন্ধকার দ্যুতিময় যখন
বাতিঘর দূর দুরগত আবছায়ায়
সামুদ্রিক ঝড় ছাপ রেখে যায় ।
বাতায়নে চোখ বোজে দাখিনা বাতাস

Wednesday, 28 September 2011

স্বপ্নসখা


স্বপ্ন  মানে  চলকে হাওয়ায়    বানভাসি
স্বপ্ন  মানে   সূর্যচোখে          চোখরাখি
স্বপ্ন  মানে  চাঁদেরমনের       বাঁধভাঙ্গি
স্বপ্ন মানে   বৃষ্টিসুখে           ঝমঝমি
স্বপ্ন মানে   অজানপথে        দিইপাড়ি
স্বপ্ন মানে   গহীনগাঙ্গে        ডুবমারি
স্বপ্ন  মানে   বিরানপথের      ঘুমকাড়ি
স্বপ্ন মানে   নিদাঘবেলায়      ফুলতুলি
স্বপ্ন মানে   পাহাড়  চড়ে       দুখমাগি
স্বপ্ন মানে    দীর্ঘপথে           চলহাটি
স্বপ্ন  মানে   মনমাঝিতে         বৈঠাবাই
স্বপ্ন মানে    হৃদয়মাঝে         হাতরাখি।
by Nandita Bhattacharjee on Wednesday, September 28, 2011 at 8:43pm

Tuesday, 27 September 2011







  • মীরা দেব বর্মণ- একটি তারা, মেঘে ঢাকা !

    By Nandita Bhattacharjee · Last edited last Wednesday · Edit Doc · Delete
                          ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক
                         পায়েলখানি বাজে ।
                         মাদল বাজে সেই সংকেতে
                          কালো মেয়ে নাচে ।
                         পাগলপারা চাঁদের আলো
                         নাচের তালে মেশে।। ‘

    ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক পায়েল খানি বাজে’ – গানটিতে কালো মেয়ের ,  শ্যামা মায়ের ‘নিটোল পায়ের’ ভাবনা  কোণ কবি ভাবতে পারেন সেটা নিয়ে বেশ ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম ।কেমন কবি মায়ের পবিত্র পা নিয়ে এমন জাগাতিক কল্পানায় মাততে পারেন। সমস্ত গানের  কথার মধ্যে একটি জাগাতিক মাদকতা।পাগলপারা আবিলতা। romanticism. এমন আধুনিক ভাবনা আমাদের ভক্তিমুলক গানের মধ্যে খুব কমই পাওয়া যায়।এক বন্ধুর  শরনাপন্ন হলাম  ।গান বাজনার যথেষ্ট খবর রাখে ।বলল শচিন কর্তার  স্ত্রী –মীরা দেব বর্মণের হইতে পারে ।মীরা দেব বর্মণ ? গান লিখতেন নাকি? কই সেভাবে ত শুনিনি । কই কখনও তো   সেটা নিয়ে মাতামাতি হয়নি!প্রচার নেই কোনও! তার সমসাময়িক সকল গীতিকারদের কথা বেশ সগৌরবে শোনা যায় । তবে মীরা দেববর্মণের নামটি  ধুলোয় চাপা পড়ে রইল কেন?  প্রছন্ন অগৌরবে? সে যে এক মহা খটকা !!
    খুঁজতে খুঁজতে পেলাম  মীরা দেব বর্মণের এক নিকট আত্মীয়ের সরব কথা ,’korta was born genius,but Meera played an important role behind preserving his tunes by weaving them to-gether in notetions.Otherwise most of gems would have been lost.’
    মীরা দেব বর্মণ যে শুধু তাঁর স্বামী শচীন দেব বর্মণের গানের নোটেশন  সংরক্ষনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন তাই নয়। স্বামী ও পুত্রের চরম উৎকর্ষে  পৌঁছে দেয়ার মাপকাঠি  নির্দ্দিষ্ট করেছিলেন । অবশ্যই নিজেকে প্রচারের আলোয় না নিয়ে এসে । থেকেছেন আড়ালে ।
    অসামান্য সঙ্গীতের বোধ ও শিক্ষা তাঁর ছিল ।তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার ,সঙ্গীতশিল্পী  ও  নৃত্যশিল্পী। প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন ,সেই সঙ্গে যুগের তুলনায় সঠিকভাবে তালিমও পেয়েছিলেন। কেবলমাত্র শচীন দেব বর্মণের স্ত্রী বা রাহুল দেব বর্মণের মা ছিলেন কি তিনি? ‘she was a gem’  শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তুখোড় জ্ঞান সম্পন্ন গায়িকা ,নৃত্যশিল্পী ,রবীন্দ্রসংগীতেও সমান দক্ষতা,গানের কথাকার হিসেবে আধুনিক মনষ্কতা ,শব্দের  ব্যবহার , মাটির কাছাকাছি  থাকার  প্রবনতা,  অবাক হতে হয় ; assistant music director – হিসেবে ও চমক দেয়ার মত সুরের বিভা ছিল তার । শচীন দেব বর্মণের যে গান গুলোর সুরের আবেশে মাতাল হই ও নিয়ত গুন গুন করি—সে গুলোর অনেক সুর ই মীরা  দেববর্মণের সহায়তায় তৈরি হয়েছে ।
    জন্মেছিলেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানের(এখন বাংলাদেশ) কুমিল্লা জেলায়।  দাদু ও দিদিমার বাড়ীতে জন্ম থেকেই  থাকা পারিবারিক অসুবিধার কারনে। দাদু রায় বাহাদুর কমলনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন ঢাকা হাইকোর্ট-এর চিফ জাস্টিস। তারপর কলকাতার সাউথ এন্ডে বসবাস শুরু করেন দাদু দিদিমার সঙ্গে। সেখানে  শুরু হয় পড়াশুনো সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীত এর তালিম। দাদু দিদিমার বাড়ীতে বিদ্যালয় শিক্ষা ও সঙ্গীত শিক্ষা সমানতালে চলে।দাদু রায় বাহাদুর কমলনাথ  দাশগুপ্ত অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন ।নাতনীর সঙ্গীত শিক্ষার যথেষ্ট আয়োজন করেছিলেন । সঙ্গীত গুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন; কীর্তন ও ঠুমরী শেখেন সঙ্গীতাচার্য ধীরেন্দ্রনাথ দেবের কাছে ;১৯৩০ সালে আনাদি দস্তিদারের কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিক্ষা লাভ করেন এমন কি শান্তিনিকেতনে আমিতা সেনের কাছে নৃত্যচর্চাও করেন ।সঙ্গীতের সকল ক্ষেত্রে সমান পারদর্শিতা  ছিল তার। নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন, সম্পূর্ণ ছিল সুরের জ্ঞান ।
    ১৯৩৭ সালে  এলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্সে তাঁর দেখা হয় শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হন শচীন ।বিয়ে হয় ১৯৩৮ সালে । বয়েসের তাফাত ছিল অনেকটাই ।এ ছাড়া শচীন ছিলেন ত্রিপুরা রাজ পরিবার ভুক্ত । তাই আপত্তি উঠেছিল ।ঝড়  উঠেছিল দুই পরিবার থেকেই ।কিন্তু  দুজনেই ছিলেন অনড় ।তাই শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল সাড়ম্বরে ।শচীনএসেছিলেন ঘোড়ায় চড়ে ,হাতে তারবারি । বসেছিল নহবতখানা, বাজিয়েছিলেন আলি হুশেন খাঁ ।  রাহুলের জন্ম ১৯৩৯ সালের জুন মাসে ।
    বিবাহের বছরে ই All  India Radio, kolkata থেকে অডিশন দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন।শুরু করলেন পড়াশোনাও।আই এ পরীক্ষাই বসলেন ।কিন্তু সংগীতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন অনেক আগেই তাই পড়াশোনায় ইতি দিয়ে সঙ্গীতের পথ ধরেই হাঁটলেন। ইতিমধ্যে শচীন দেব বর্মণ তার সঙ্গীতের অভিমুখ বম্বের দিকে নিদ্দির্ষ্ট করলেন ।আর এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। বম্বে গিয়ে মীরা দেবী ফয়াজ মহম্মদ খানের কাছে আবার তালিম নিতে শুরু করলেন। সঙ্গীতের পিপাসা ছিল অসীম। নিজেকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস চলছিল নিরন্তর।১৯৪৫ সালে All India Radio,Bombay থেকে অডিশন পাশ করে ঠুংরি ও গজল পরিবেশন করতেন। BOMBAY IPTA-র সংগেও যোগাযোগ ছিল ।বম্বের সাংস্কৃতিক  জগত তখন  প্রগতিশীলতার কেন্দ্র।  সেই সময় দুটি নাটক শান্তি ও নয়া প্রভাতের  গানের কথা রচনা করেন। শচীণ দেব বর্মণের সঙ্গে অনেক গানের রেকর্ডও করেন তিনি –আজ দোল দিল কে~(১৯৪৬),তুম হ বড়ে চিতচোর ~(১৯৪৬),কেন হায় স্বপ্ন ভাঙ্গার আগে~(১৯৪৯),কালি বদরিয়া ছা গয়ে, ডালি ডালি ফুল~(১৯৪৮),কে দিল ঘুম ভাঙ্গায়ে~(১৯৪৯)।                                                          
                              Assistant Music Director হিসেবেও তার বিকাশ ছিল উজ্জ্বল। সেই সময় কজন মহিলা সঙ্গীত পরিচালিকা ছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ।  সময় থেকে সব বিষয়েই এগিয়ে ছিলেন তিনি।স্বাকিয়তা ছিল তার সব সৃষ্টির মূল কথা। নয়া জমাণা, তেরে মেরে স্বপ্নে , শর্মিলি ,অভিমান , বারুদ ,প্রেম নগর – এই বিখ্যাত চলচ্চিত্র গুলোর সহযোগী সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। এই চলচ্চিত্র গুলোর সুরের অভিযান মুখরিত করেছিল সমস্ত শ্রোতাদের । এখনো এগুলো আমাদের কাছে স্বর্ণযুগের গান । মন গাথা সুর সে সব। কিছু কিছু গানের যেমন- ইয়ে দুনিয়া আগর মিল যায়ে তো (রফি,পেয়াসা,১৯৫৭) ,কোই আয়া ধড়কন (আশা ,লাজবন্তী , ১৯৫৮), ওয়াক্ত নে কিয়া ,(গীতা দত্ত,কাগজ কে ফুল ,১৯৫৯) ,উচে সুর মে গায়ে যা, (কিশোর,হাউস নং-৪৪,১৯৫৯),মেরে বৈরাগী ভওমরা, (লতা,ইস্ক পর যোর নেহি,১৯৭০), শুন শুন শুন মেরী (লতা,ছুপা রুস্তম,১৯৭৩)-সুরের মূর্ছনায় আবিষ্ট হয়েছিল মানুষ ।তাঁর কথায় কয়েকটি বিখ্যত বাংলা গান-আজ দোল দিল কে বীণায়, কেন আলেয়ারে বন্ধু ভাবি,বাঁশী তার হাতে দিলাম,ভঙ্গিতে ওর নেশা, বিরহ বড় ভাল লাগে,গানের কলি সুরের দুরিতে,ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা,বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতে, কালসাপ দংশে আমায় ,কে যাস রে ভাটি গাঙ্গ বাইয়া,কি করি আমি কি করি, না আমারে শশী চেয়ো না , নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক, রাধার ভাবে কালা হইল, সে কি আমার দুষমন দুষমন, শোন গ দখিন হাওয়া , তাগডুম তাগডুম বাজে ।
    ১৯৭৫ সাল, স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত বম্বের বাড়ি  জেটে বাস  করেছেন।তারপর পুত্র রাহুলের সঙ্গে রাহুলের ভদ্রাসন মেরি ল্যান্ডে।কৃতী পুত্র রাহুল মারা গেলেন ১৯৯৪ সালে। পুত্র ও স্বামীর মৃত্যুর অসম্ভব শোক তাকে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় পৌছে দিল। শেষের সেদিন বড় ভয়ংকর ছিল এই অসামান্য গীতিকার, সুরমালিকার ।কথায় কথায় মালা গেথেছিলেন যিনি,বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার কথা।কেবল SD-র গান শুনলে নড়ে চড়ে উঠতেন।  চেতনার  জগত তার কাছে মুল্য হারিয়েছিল। ভাসির একটি ওল্ড এজ হোমে তার মৃত্যু হয় ২০০৭ সালের,১৫-ই অক্টোবর ।
    একজন এরকম মানুষের শেষের পরিনতি কেন ই বা এমন হয় সে এক  বিস্ময়! তার গানের অভিনব ব্যপ্তি ভরিয়ে তুলেছিল কথা ও সুরের জগত।জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শব্দ, সুর ,ব্যঞ্জনা বাঙময় হয়ে উঠেছিল তার সৃষ্টিতে।জীবনমুখী শব্দবন্ধ সেদিন ছিল না,কিন্তু লোকজীবনেরই কথকঠাকুর ছিলেন তিনি।
    বাংলাদেশ  স্বাধীন হওয়ার পর  মাতৃভূমির টানে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। যখন ফিরছিলেন গ্রামের পুকুর পার দিয়ে, দেখলেন একটি চৌদ্দ –পনের বছরের মেয়ে  পুকুর পারে বসে হাপুশ নয়নে কাঁদছে ।দু চোখে তার জলের ধারা।  জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি বলল –সদ্য বিয়ে হয়েছে, ভাই আসবে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। সকাল থেকে অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত সে, ভাইয়ের আর দেখা নেই। তৈরি হল মন আকুল করা কথা ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া আমার ভাই ধনরে কইও নাইয়র নিত আইয়া’।এমনি ছিল  মাটি দিয়ে তার প্রতিমা গড়া।
                                              শুধু বোঝা গেল না এমন মরমী  শিল্পীর প্রাপ্তির ঘর এত শূন্য কেন? শেষের কটা দিন ই বা কেন এত কষ্টে কাটাতে  হল শব্দসম্রাজ্ঞীকে? একটি পুরস্কারও তার জন্যে বরাদ্দ হল না? আশ্চর্য নীরব চরাচর!
                                 “রইল তাহার বানী, রইল ভরা সুরে,রইবে না সে দূরে—“
                                    ~~~~~~~~~~ঃঃঃঃ~~~~~~~                              

      • Anupam Das Sharma বাঃ দারুন অজানা তথ্য। জানলাম। সংশোধন যদি সম্ভব হয়- কমলনাথ দাসগুপ্ত.... কমলনাথ দাশগুপ্ত হবে। বৈদ্যজাত ভুক্ত সুবাদে... আমার জানা।
        September 20 at 8:08pm ·
      • Nandita Bhattacharjee thnks,,,,
        September 20 at 8:09pm · · 1 person
      • Nandita Bhattacharjee ojana bole i khuje ber kora,,,,,era sob somoye prodiper niche thaken,,,shudhu alo diye jaoai kaj,,,,
        September 20 at 8:11pm · · 2 people
      • Anupam Das Sharma Sotti kotha.. Meera Deb Barman je eto Gunii chhilen ei etota prothom janlam.. Gr8 thnx to you N a n d i t a .....
        September 20 at 8:12pm ·
      • Nandita Bhattacharjee আমিও এভাবে জেনেই চমকে উঠি ও খুজতে থাকি ্‌্‌্‌্‌
        September 20 at 8:59pm · · 1 person
      • Mostak Al Mehedi সমৃদ্ধ হয়েছি । আপনার লেখাটি পড়তে পড়তে অবাক হয়েছি, মীরা বর্মনের জন্য কষ্টও পেয়েছি । বেঁচে থাকা এক ধরনের অভিমান ।
        September 20 at 11:27pm via mobile ·
      • Nandita Bhattacharjee একদম ঠিক মস্তাক ভাই্‌্‌
        September 20 at 11:2


প্রিয়মুখ অসহায়-একটি সনেট

প্রিয়মুখ অসহায়-একটি সনেট

by Nandita Bhattacharjee on Thursday, September 22, 2011 at 9:36pm
প্রিয়মুখ, আদুরে গ্রহটি হাঁটে পথ অসহায়
জন্মলগ্ন থেকে আগুন  হাতে হাত রয়
সারা শরীর ছিন্নভিন্ন টেকটনিক ভয়
ভাসমান মাটিতে ভাসে  মুখ অক্ষয়
নিরবচ্ছিন্ন অনিশ্চিত অনিকেত সময়।
আগুণের পিঠে বসে সেঁকে নেয় গ্রীবা
তরপর,তারপর ,কত  কত চলা বাঙ্ময়
অমোঘ অস্তিত্ত্ব সংকটে  ঢেকে দেয় আভা।


হঠাৎ হঠাৎ ছায়া পড়ে অভিমানী ঠোঁটে
শরীর মোচড় দেয় ঘন হয় প্রারম্ভিক মান
কম্পনে বহমান শরীর ঝটিতি দুলে ওঠে
হিমবাহ গলে যায় জলে ভরে  হ্রদের উঠান
সহ্যের সীমানায় কাঁটাতার অচিরে ফোটে
মোছা যায় না শুধু জন্ম-লগ্ন-ক্ষণ ,কপাল লিখন।